ঢাকা | বঙ্গাব্দ

সিলেটি ভাষাকে নিয়ে কটাক্ষ: তীব্র ক্ষোভ ও নিন্দার ঝড়

  • নিউজ প্রকাশের তারিখ : Aug 3, 2026 ইং
ঐতিহ্যবাহী ‘সিলেটি ভাষা’ ছবির ক্যাপশন: ঐতিহ্যবাহী ‘সিলেটি ভাষা’
ad728

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সমৃদ্ধ ও ঐতিহ্যবাহী ‘সিলেটি ভাষা’ নিয়ে কটাক্ষ করে প্রকাশিত একটি ভিডিওকে কেন্দ্র করে দেশ-বিদেশে থাকা সিলেটি ভাষাভাষী ও সচেতন মহলের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও নিন্দার ঝড় উঠেছে। সম্প্রতি এক যুবকের তৈরি ওই অবমাননাকর ভিডিওটি ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়ার পর থেকে নেটিজেনরা এর কড়া প্রতিবাদ জানাচ্ছেন।

বিভিন্ন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠন এই ধরনের অপপ্রচারকে বিকৃত মানসিকতা এবং সস্তা জনপ্রিয়তার অপচেষ্টা বলে আখ্যা দিয়েছে। তারা বলছেন, ইতিহাস ও ব্যাকরণগত ভিত্তি না জেনে একটি প্রাচীন ও সমৃদ্ধ ভাষাকে নিয়ে কটূক্তি করা অত্যন্ত দুঃখজনক। একই সাথে ভাষা গবেষক ও সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা ঐতিহ্য না জেনে যেকোনো ভাষার অবমূল্যায়ন করার মানসিকতা থেকে সবাইকে বিরত থাকার আহ্বান জানিয়েছেন।

সিলেটি ভাষার ইতিহাস ও ভাষাতাত্ত্বিক মর্যাদা

ভাষাবিজ্ঞানীদের মতে, সিলেট অঞ্চলের কথা বলার ধরন কেবল কোনো সাধারণ আঞ্চলিক উপভাষা (Dialect) নয়; বরং এর রয়েছে স্বতন্ত্র ধ্বনিব্যবস্থা, ব্যাকরণগত কাঠামো, বৈচিত্র্যময় শব্দভাণ্ডার এবং দীর্ঘ ঐতিহাসিক লিপি।

প্রাচীন প্রাকৃত থেকে স্বতন্ত্র বিকাশ: বাংলা ও সিলেটি—উভয় ভাষাই প্রাচীন পূর্বাঞ্চলীয় প্রাকৃত (মাগধী প্রাকৃত) থেকে উদ্ভূত হয়েছে। বাংলা ভাষার রূপান্তরের পাশাপাশি সিলেটের ভৌগোলিক ও রাজনৈতিক বৈশিষ্ট্যের কারণে সিলেটি ভাষা নিজস্ব স্বকীয়তায় বিকশিত হয়েছে। এতে প্রাচীন প্রাকৃত ও অপভ্রংশীয় বহু শব্দ ও ধ্বনি আজও অবিকৃতভাবে টিকে আছে।

স্বতন্ত্র ‘ছিলটি নাগরী’ লিপি: বিশ্বের খুব কম লোকভাষার নিজস্ব বর্ণমালা বা লিপি থাকে। ১৪ শতকে হযরত শাহ জালাল (র.) ও তাঁর সঙ্গী সুফি-সাধকদের আগমনের পর ফার্সি, আরবি ও স্থানীয় ভাষার সংমিশ্রণে ‘ছিলটি নাগরী’ লিপির উদ্ভাবন ঘটে। এই লিপিতে লিখিত শত শত পুথি ও সাহিত্য আজও সিলেটের ইতিহাস ও সংস্কৃতির অনন্য দলিল হিসেবে রক্ষিত আছে।

মরমী সাহিত্য ও বিশ্বজনীনতা: হাসন রাজা, শাহ আবদুল করিম, রাধারমণ দত্ত, দুর্বিন শাহের মতো বিশ্বখ্যাত মরমী সাধক ও চারণ কবিদের হাত ধরে সিলেটি ভাষার সাহিত্য বিশ্বদরবারে স্থান করে নিয়েছে। তাঁদের রচিত গান ও দর্শনে সিলেটি ভাষাশৈলী অমলিন হয়ে আছে।

আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে বিস্তৃতি: যুক্তরাজ্য (ইউকে), যুক্তরাষ্ট্র, মধ্যপ্রাচ্য এবং ভারতের আসাম ও ত্রিপুরা রাজ্যসহ বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে থাকা কোটি কোটি মানুষ দৈনন্দিন জীবনে এই ভাষা ব্যবহার করছেন। এমনকি যুক্তরাজ্যের লন্ডনের মতো আন্তর্জাতিক নগরীতে সিলেটি ভাষার লিখিত নির্দেশনা ও গবেষণার নজির রয়েছে। বেশ কিছু আন্তর্জাতিক বিশ্ববিদ্যালয় ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানেও নাগরী লিপি ও সিলেটি ভাষা নিয়ে উচ্চতর কাজ চলছে।

সুশীল সমাজের মতামত ও আহ্বান

দৈনিক দুর্বারের সাথে আলাপকালে বিশিষ্ট জনেরা জানান, অন্য কোনো ভাষা বা আঞ্চলিক সংস্কৃতিকে ছোট করে দেখার মধ্যে কোনো বীরত্ব নেই। ভাষার বৈচিত্র্যই বাংলাদেশের মূল সাংস্কৃতিক শক্তি। না জেনে কটাক্ষ করার সংস্কৃতির অবসান হওয়া প্রয়োজন।

তারা আরও বলেন, যেকোনো জনগোষ্ঠীর ভাষার প্রতি সম্মান প্রদর্শন করা সভ্য সমাজের মৌলিক দায়িত্ব। এ ধরনের অবমাননাকর কন্টেন্ট তৈরির আগে সংশ্লিষ্ট সবাইকে ইতিহাসের সত্যতা ও ভাষার সমৃদ্ধি সম্পর্কে জেনে নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।


নিউজটি আপডেট করেছেন : দৈনিক দুর্বার

কমেন্ট বক্স